মোশাররফ করিমের জীবন কাহিনী!

বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা হলেন মোশাররফ করিমের। তার অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা বাংলাদেশের অভিনয়জগতে এক আলাদা স্থান করে দিয়েছে। অসাধারণ সব নাটকের মাধমে মন জয় করে নিয়েছে সব শ্রেনীর দর্শকের।

মোশাররফ করিম ১৯৭০ সালের ২২শে আগস্ট ঢাকায় জন্মগ্রহন করেন।
যদিও তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহন করেন, তার বাড়ি বরিশাল-এ। ডেইলি স্টার-এ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন যে তার অভিনয়ে দক্ষতা জন্ম নেয় তার স্কুল থিয়েটারে। ১৯৮৬ সালে তিনি নাট্যকেন্দ্র-এ যোগদান করেন। তিনি এখনও এই নাট্যদলের সদস্য হিসেবে আছেন।

মোশাররফ করিমের অভিনয় জগতের কিছু ইতিকথাঃ

আড়িয়াল খাঁ পাড়ের পিঙ্গলাকাটী গ্রাম। এই গ্রামেরই আব্দুল করিম স্বপ্ন দেখেছিলেন। দেশবিখ্যাত অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন। কপালের ফের, আব্দুল করিমের সেই স্বপ্ন শেষতক সত্যি হয়নি। সে সময় যাত্রাপালার দিকে ঝোঁক ছিল আব্দুল করিমের। নিজের এলাকায় খানিকটা নামডাকও সবে ছড়াতে শুরু করেছিল তাঁর। কিন্তু নামডাক দিয়ে তো আর পেট ভরে না। তত দিনে সংসার বড় হতে শুরু করেছে। বৈষয়িক ভাবনাচিন্তা অচিরেই কাবু করে ফেলল আব্দুল করিমকে। অভিনয়-অন্তপ্রাণ এই মানুষটা একদিন সত্যি সত্যিই তাঁর প্রিয় জগৎ থেকে পুরোপুরি ইস্তফা নিয়ে নিতে বাধ্য হলেন। মন দিলেন ব্যবসায়। বরিশালের পিঙ্গলাকাটীর আব্দুল করিমের অভিনেতা বনে যাওয়ার স্বপ্ন এভাবেই মাঠে মারা গেল।

সংসার ভেসে যাওয়ার ভয়ে আব্দুল করিম অভিনয় ছেড়েছিলেন। ঢাকার বাসিন্দা হয়েছিলেন। খুব সত্যি কথা। কিন্তু ওই যে অভিনয়ের দিকে তাঁর অন্তরের টান, সেটা ফিকে হয়নি কখনো। প্রমাণ, তাঁর অষ্টম সন্তান মোশাররফ হোসেন। একদম ছোট্টটি থেকেই পাজির পা ঝাড়া। ভুল করেও কোনো দিন বইখাতার নাম মুখে আনে না। সাইকেলে চেপে কোথায় কোথায় ঘুরতে চলে যায়। ডানপিটে ছেলেকে কোনোমতেই কায়দা করতে না পেরে শেষে অন্য রাস্তা দেখলেন বাবা। উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশযাত্রার মতো ছেলেকে ফেরত পাঠালেন বরিশালের গ্রামের বাড়িতে।

মোশারফ গ্রামে ফিরে গেলেন। গ্রামে গিয়ে ভালো রকমের বেকায়দায় পড়ে গেল মোশাররফ। তার পরিচিত বন্ধুরা নেই। যখন তখন খেলতে যাওয়া বারন ছিলো। সাইকেলে চেপে ঘোরাঘুরি নেই। বিদ্যুৎ নেই বাড়িতে। দুনিয়ার সব অশান্তি।

মেজো ভাইয়ের ভয়েই কি না কে জানে, একসময় সত্যি সত্যিই স্কুলের “ভালো ছেলে” হয়ে উঠতে লাগল এককালের “স্কুল পলাতক” ছেলেটা। যে অঙ্কের কথা শুনলে তাঁর ঘাম দিয়ে জ্বর আসত সেই অঙ্কেই পেল ৯৮। তাজ্জবের ওপর তাজ্জব। যে গ্রামে এসে পেরেশানির শেষ ছিল না সেই গ্রামই একসময় প্রিয় হয়ে উঠতে লাগল মোশাররফ করিমের কাছে।

অন্যদের অঙ্গভঙ্গি, গলার স্বর নকল করার অভ্যাসটা তার ছিল শুরু থেকেই। বাবার প্রশিক্ষণের কল্যাণে আবৃত্তি করত চমৎকার। হাইস্কুলে ওঠার পর এসব আপাত ছোটখাটো গুণই আলাদা করে তুলতে শুরু করল মোশাররফকে। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মানেই মোশাররফ ময়। আবৃত্তিতে প্রথম পুরস্কার তো অভিনয়ে জোরদার হাততালি। একই সঙ্গে চলছিল যাত্রাপালায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করা।

মা আর বড় ভাইয়েরা মোশাররফের অভিনয়প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হওয়ার চেয়ে শঙ্কিতই হয়ে উঠছিলেন বেশি কিন্তু মাথার ওপরে বটবৃক্ষ হয়ে ছিলেন বাবা। আব্দুল করিম জানতেন, যাত্রার দিকে ঝোঁক মানেই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তাই সামনাসামনি ছেলেকে উৎসাহ দেওয়ার সাহস পেতেন না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে মনেপ্রাণে চাইতেন, ছেলে যেন অভিনয়টা চালিয়ে যায়। ছেলেকে উসকে দিতেই তিনি ঢাকায় এনে তাকে রীতিমতো টিকিট কেটে নিয়ে যেতেন মঞ্চনাটক দেখাতে। তারা দুজন প্রায় ই যেতো সেখানে।
তার এই গোপন বাসনা অপূর্ণ থাকেনি। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা তিনি দেখেছিলেন ছেলে মধ্যে। মোশাররফ করিমও বাবাকে বিমুখ করেননি। সেই মোশাররফ করিম এখন আমাদের দেশের উজ্জ্বলতম এক তরুণ অভিনয়প্রতিভার নাম।
মোশাররফ বলেন, আমার জীবনে অনেক মিরাকল আছে। মিরাকল। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্যারাম করাটা তাঁর একটা।

যে সময় ক্যারাম করার প্রস্তাব পেলেন ঠিক সে সময়ই মোশাররফের আরেক নাটকের কাজে যাওয়ার কথা ছিলো ব্যাংকক। তিনি হয়তো ব্যাংককই যেতেন। কিন্তু তাঁকে তাজ্জব বানিয়ে ক্যারাম করার জন্যই পীড়াপীড়ি শুরু করলেন স্ত্রী রোবেনা রেজা জুঁই। মোশাররফ স্ত্রীর কথায় রাজি হলেন। আর এই ক্যারামই বদলে দিল মোশাররফ করিম নামের এক অভিনেতার জীবন।
এসএসসি পাস করে ঢাকায় এসে নাম লিখিয়েছিলেন নাট্যকেন্দ্রে। সেখানেই পেলেন তারিক আনাম খান, ঝুনা চৌধুরী, জাহিদ হাসান এবং তৌকির আহমেদের মতো মানুষজনের সাহচর্য। সেটাই তাঁকে গড়ে দিয়েছিল অনেকখানি। তাই মঞ্চই ছিল মূল ধ্যানজ্ঞান (বিচ্ছু, তুঘলক, সুখ, হয়বদন, ক্রসিবল)। টিভি নাটকের কিছু কিছু প্রস্তাব আসত ঠিক, কিন্তু প্রায় সময়ই ব্যাটেবলে মিলত না। ক্যারাম করতে গিয়ে বুঝলেন, টিভি নাটকেও মঞ্চের মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষজন আছে। চরিত্রের মধ্যে চোখকান বুজে ডুব দেওয়ার সুযোগ আছে। আর সেটাই আমূল পাল্টে দিল মোশাররফকে।

“স্রেফ একটা এক ঘণ্টার নাটক কীভাবে একজন অভিনেতার জীবন পাল্টে দিতে পারে তাঁর ভালো উদাহরণ ক্যারাম। সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগাতে চেয়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম এটাই শেষ বল। হয় ছক্কা নয় অক্কা। সম্ভবত আমি ছক্কা মারতে পেরেছি।” বলছিলেন মোশাররফ করিম।

মঞ্চ নাটকে তাকে বেশ কয়েকদিন কাজ না করার কারন হিসেবে তিনি জানান যে নাট্যকেন্দ্রের আগের প্রায় সব প্রযোজনাতেই তিনি কাজ করেছেন, তবে দলের সর্বশেষ প্রযোজনা প্রজাপতি নাটকে কাজ করতে পারেননি বলে গত দু’বছর (২০১১-২০১২) তার আর মঞ্চে উঠা হয়নি। তবে নাট্য দলের সাথে নিয়মিতই তিনি আছেন এবং থাকবেন বলে মোশাররফ জানান।

ক্যারাম নাটকের পর আর পেছনে ফেরার কোন সুযোগ ছিল না তার। কাজ শুরু করলেন সালাউদ্দিন লাভলুর ধারাবাহিক ‘ভবের হাট’ নাটকের সঙ্গে। ‘পিক পকেট’, ‘লস প্রজেক্ট’ কিংবা তৌকির আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ’ থেকে শুরু করে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ধারাবাহিক নাটক ‘৪২০’। ‘জয়যাত্রা’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয়। তৌকীর আহমেদের নতুন ছবি ‘রূপকথার গল্পে’ একটি অতিথি হিসেবে কাজ করেছেন।
নাটক লেখার কাজটা এখনো অনেক বেশি উপভোগ করেন মোশাররফ। তার বন্ধু ইউসুফ হাসান অর্কের উৎসাহেই লিখেছেন নাটক ‘একলব্য আখ্যান’, ‘সীতায়ন’, ‘নমরুদের শকুন’।

Leave a Reply