হাসান মাসুদের এপিঠ-ওপিঠ

হাসান মাসুদ একজন বাংলাদেশী অভিনেতা, পরিচালক এবং গায়ক। এছাড়াও তিনি একজন সাবেক সাংবাদিক ও সামরিক কর্মকর্তা। ১৯৬২ সালে ১৬ই ডিসেম্বর মাসে বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি।হাসান মাসুদ বরিশালে জন্মগ্রহণ করলেও বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। তিনি বি এ এফ শাহীন স্কুল, ঢাকা থেকে এস এস সি এবং সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন। হাসান ছোটবেলা থেকে গান গেয়ে আসছেন এবং তিনি ছায়ানট থেকে নজরুল সঙ্গীত এর উপর ৫ বছরের একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। তিনি একাধারে মডেল, অভিনেতা ও সাংবাদিকতার পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

কর্মজীবনে হাসান মাসুদঃ

হাসান ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং এরপর ১৯৯২ সালে প্রাত:কালীন অবসর গ্রহণ করেন। তিনি নিউ নেশনম এবং পরবর্তীতে ডেইলি স্টারে ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি ডেইলি স্টার ও বিবিসিতে কাজ করেন। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পচিালিত ব্যাচেলর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে তার পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি মেড ইন বাংলাদেশচলচ্চিত্র এবং অনেক নাটকে অভিনয় করেন। এছাড়া তিনি অসংখ্য নাটকে কাজ করে থাকেন। আর সেই সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন জীবনের সময়গুলো কাগজের মলাটে আটকে রাখার কাজ অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া গত বছর বই মেলায় ‘কনকের কথা’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন তিনি। সে সময় দারুণ সাড়া পাওয়ায় এবার তার এই নতুন প্রয়াস।
তার প্রথম সঙ্গীত অ্যালবাম হৃদয়ঘটিত ২০০৬ সালে প্রকাশ পায়।

গত ৯ জানুয়ারি সকালে হাসান মাসুদ প্রিয়.কমে’র সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমি ইংরেজিতে একটি বই লিখছি। নাম রেখেছি ‘গুড বাই’। আমার আগের জীবন নিয়ে লেখা। মানে সেনাবাহিনীর জীবনটা। আমি ভারতীয় নাগা ক্যাপ্টেনের লেখা এমন একটি বই পড়েছিলাম। তিনিও ক্যাপ্টেন থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনী থেকে পালিয়েছিলেন। তারপর বইটি লিখেছিলেন। বইটির মধ্যে খুব হিউমার আছে। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন কষ্টের সাথে সাথে কি পরিমান হিউমার হয় ঐ বিষয়টা তুলে ধরা হয়েছে। আমিও চাইছি আমার লেখা বইটায় আমার ওই জীবনের ভিন্ন কিছু বিষয় থাক। যা কখনও কেউ জানে নি।’

কথা প্রসঙ্গে মাসুদ জানালেন, ‘আমার বয়স যখন ২৫ হয়েছে, তখনই আমি ঠিক করেছি আমি আর সেনাবাহিনীতে চাকরি করব না। তবে যাই করি না কেন? আমি সৎ থাকব। আমি ফ্ল্যাশব্যাক থেকে বইটি লিখেছি। আমি প্রথম যেদিন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে আর্মির ইউনিফর্মটি পড়লাম সেদিন থেকেই গল্পটা শুরু। বইটির প্রায় ২০ শতাংশ লেখা শেষ। সামনে ঢাকা বই মেলা আসছে। সে সময় বইটি প্রকাশ করব।’

এদিকে বর্তমানে আগের মতো টিভি নাটকে দেখা মিলে না হাসান মাসুদের। মানহীন গল্প আর নির্মাণে মুন্সিয়ানা না থাকার কারণে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন। যেখানে বাজেট বড় একটি সমস্যা বলে তিনি মনে করেন। আর একদিনে একটি নাটকের তিন-চার পর্বের দৃশ্যধারণ হয়। অনেকটা ধর তক্তা মার পেরেকের মতো অবস্থা। যা তার অভিনয় ক্যারিয়ারের সঙ্গে মানানসই নয়। শুধু পছন্দসই হলেই সে নাটকে অভিনয় করেন তিনি। তবে মাসের বড় একটা সময় রাখেন-নিজের পারিবারিক জীবন আর ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যবোধের জন্য।

আর হাসান মাসুদের ভাষায় বলতে গেলে, আমি আগে যেভাবে নাটকে কাজ করতাম, সেটি কমিয়ে দিয়েছি। প্রতিদিন আমাকে টিভিতে দেখা যাক, এটি আমি এখন আর চাই না। আমার সময় কেটে যাচ্ছে। আমার একা থাকতে ভালো লাগে। আর ইন্টারনেটের যুগে আসলে একা থাকার কোন উপায় নেই। এখন কখনও কখনও টানা ১৫দিন শুটিং করতে হয়। তখন বেশ একঘেঁয়েমি লাগে। এজন্য এখন একটা কাজ করে শেষ করে কিছুটা সময়ের জন্য ছুটি নেই।

ব্যতিক্রম কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে না। এখন তো নাটকের মধ্যে ঘুষও ঢুকে গিয়েছে। এমনটা মন্তব্য করে হাসান মাসুদ বলেন, ‘আমরা অভিনেতারা আসলে পিছন ফিরে তাকাই না। ভাবি না কোন ধরনের নাটকগুলোতে অভিনয় করে সফল ছিলাম। নাকি এখন যে ট্রেন্ড চলতেছে সেই ট্রেন্ডের সাথেই যাবো। সবাইকেই আমি অনুরোধ করি-একটু পিছন ফিরে তাকান। কোন নাটকগুলো করে তারা সমাদৃত হয়েছেন। আর এখন তো অনেকগুলো সংগঠন দাঁড়িয়েছে যার কারণে এ দৃশ্য একটু পরিবর্তন হবে।’

মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ব্যাচেলর’ এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে তার পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’সহ অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। হাসান মাসুদ বলেন, ‘আমি যদিও বলি ২০০৩ এ ‘ব্যাচেলর’ ছবিতে শুটিং করি, আসলে আমাদের কাজটুকু ২০০৪ থেকে শুরু হয়। সে সময় যে ধরনের গল্প, কিংবা নির্মাণের মুন্সিয়ানা যেমন ছিল-সবকিছু মিলিয়ে ছিল এখন সেটি নাই। এখন তো প্রচুর শুটিং হচ্ছে। কিন্তু দর্শক কতজন পরিচালককে চিনেন?’

‘ব্যাচেলর’ ছবিতে অভিনয় করে দারুণ প্রশংসিত হওয়ার পর বেশ কিছু ছবিতে দেখা মিলেছে হাসান মাসুদের। কিন্তু সেভাবে আর জমে উঠে নি। বিষয়টি এমন কেনো?

‘হিরো-হিরোইনের বাইরে যে যত বড় চরিত্রেই অভিনয় করুক না কেন, বাংলাদেশে পরিচালক কিংবা প্রযোজকের কাছে তাদের কোন দামই নাই। তারা সেটিই বোঝেই না। তাদের স্টোরিটা বেইজড হচ্ছে কিসের উপর? প্রেমটা যে গল্প, সেখানে সালাদ আইটেমটা কি সেটিই তারা বুঝেন না! তবে আমার নিজের প্রতি নিজের আত্মসম্মানের একটি বিষয় তো আছে। আমার পরিচালকদের শিল্পী নির্বাচন ভালো না। আমি নেতিবাচক চরিত্রের শিল্পী। কিন্তু তারা আমাকে নাটকে যেভাবে দেখেন চলচ্চিত্রেও সেভাবেই উপস্থাপন করতে চান। তাই এখন আর চলচ্চিত্রে অভিনয় করি না।’ বললেন হাসান মাসুদ।

গানের মানুষ হিসেবেও পরিচয় রয়েছে হাসান মাসুদের। তার প্রথম সঙ্গীত অ্যালবাম ‘হৃদয়ঘটিত’ ২০০৭ সালে প্রকাশ পায়। তারপর থেকে তার আর গানের সঙ্গে সখ্যতাটা গড়ে উঠে নি। কেন?

তিনি বলেন, ‘এরপর তো সঞ্জীবই (সঞ্জীব চৌধুরী) মরে গেল। গান গাওয়ার শখটাও মরে গেল। আমার ছোটবেলার ক্ল্যাসমেটও। খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম আমরা। আর স্কুলের পাশেই ছিল সঞ্জীবদের বাসা। দুপুরে ওদের বাসায় খেতাম। আর ওর দিদিকে গানের কিছু বিষয় শিখিয়ে দিতাম। আমি আরও দিদি একসাথে ছায়ানটে গান শিখতাম। তখন সঞ্জীব গান গাইতো না। গান গাইতাম আমি। শুনতো সঞ্জীব।’

Leave a Reply